প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলতে মানব ইতিহাসের সেই সুদীর্ঘ সময়কালকে বোঝায় যার কোনো লিখিত উপাদান বা নথিপত্র পাওয়া যায় না; এই যুগের ইতিহাস মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য ও প্রস্তর হাতিয়ারের ওপর নির্ভর করে পুনর্গঠন করতে হয়। WBCS প্রিলিমিনারি এবং মেনস (Paper III) পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের এই প্রথম অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন যুগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র (sites), আবিষ্কৃত হাতিয়ার, কৃষিকাজের সূচনা ও তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতি নিয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্ন এসে থাকে। নিচে পালিওলিথিক, মেসোলিথিক, নিওলিথিক এবং তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতির পর্যায়ক্রমিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
অর্থ ও সময়কাল: গ্রীক শব্দ 'প্যালিও' (Paleo = প্রাচীন) এবং 'লিথিক' (Lithic = প্রস্তর) থেকে পালিওলিথিক শব্দের উৎপত্তি। আনুমানিক ২.৫ মিলিয়ন বা ৬,০০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এই যুগ বিস্তৃত ছিল, যা মূলত প্লেইস্টোসিন বা তুষার যুগের (Ice Age) অন্তর্গত।
তিনটি উপ-পর্যায় ও বৈশিষ্ট্য:
সময়কাল: আনুমানিক ৬,০০,০০০ - ১,৫০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
হাতিয়ার: প্রধানত কোয়ার্টজাইট (Quartzite) পাথর দিয়ে তৈরি চপার-চপিং হাতিয়ার (Chopper-Chopping tools), হাতকুঠার (Hand-axes) ও ক্লিভার (Cleavers)।
প্রধান কেন্দ্রসমূহ:
সোহান উপত্যকা (Sohan Valley, পাকিস্তান): সোহান সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত, যেখানে নুড়ি পাথরের (Pebble industry) হাতিয়ার মেলে।
ভীমবেটকা (Bhimbetka, মধ্যপ্রদেশ): রাইসেন জেলায় অবস্থিত বসতি ও কারখানাকেন্দ্র (Habitation-cum-factory site)।
আত্তিরামপাক্কাম (Attirampakkam, তামিলনাড়ু): আকুলিয়ান (Acheulian) হাতকুঠার শিল্পের বিখ্যাত কেন্দ্র।
হাতনাউরা (Hathnora, মধ্যপ্রদেশ): নর্মদা উপত্যকায় এখান থেকে হোমো ইরেক্টাস (Homo erectus) বা আর্কেয়িক হোমো স্যাপিয়েন্সের খুলির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে।
সময়কাল: আনুমানিক ১,৫০,০০০ - ৩৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
হাতিয়ার: ফ্লেক ইন্ডাস্ট্রি বা পাথরের চাঁই/পাতলা অংশ (Flakes) থেকে তৈরি ফ্লেক-হাতিয়ার, যেমন চাঁছনি (Scrapers), বিদ্ধকরণ যন্ত্র (Borers) ও পয়েন্ট (Points)। এই যুগকে 'Flake culture' বা নিয়ান্ডারথ্যাল মানুষের যুগও বলা হয়।
প্রধান কেন্দ্রসমূহ: নেভাসা (Pravara river, মহারাষ্ট্র - যেখানে এইচ. ডি. সংকালিয়া এটি প্রথম চিহ্নিত করেন), দিদওয়ানা (রাজস্থান), ভীমবেটকা, সামনাপুর (নর্মদা উপত্যকা)।
সময়কাল: আনুমানিক ৩৫,০০০ - ১০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ (তুষার যুগের শেষ পর্ব)।
হাতিয়ার ও বৈশিষ্ট্য: ব্লেড ও বুরিন (Blades & Burins) শিল্পের বিকাশ। এই যুগে আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo sapiens)-এর প্রথম আবির্ভাব ঘটে।
প্রধান কেন্দ্র ও শিল্পকলা: ভীমবেটকা গুহাচিত্রে লাল ও সবুজ রঙের প্রাচীনতম চিত্রাঙ্কন মেলে। মহারাষ্ট্রের পাটনে (Patne) উটপাখির ডিমের খোসার ওপর নকশা আবিষ্কৃত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের সোন উপত্যকার বাঘোর-১ (Baghor) থেকে প্রারম্ভিক পূজামণ্ডপ বা বেদীর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অর্থ ও সময়কাল: পালিওলিথিক ও নিওলিথিক যুগের মধ্যবর্তী পরিবর্তনকালীন পর্যায় (Transitional phase), যা আনুমানিক ১০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৪,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত (হোলোসিন যুগ)।
হাতিয়ার (Microliths):
জ্যামিতিক ও অজ্যামিতিক ক্ষুদ্রাশ্ম বা মাইক্রোলিথ (Microliths) হলো এই যুগের প্রধান পরিচয়। এগুলো সাধারণত ১ থেকে ৫ সেমি দীর্ঘ হতো এবং চাট, চালসেডনি, জ্যাসপার ও কোয়ার্টজ দিয়ে তৈরি হতো।
১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এ. সি. এল. কারলাইল (A.C.L. Carlleyle) বিন্ধ্য পর্বত থেকে প্রথম মাইক্রোলিথ আবিষ্কার করেন।
পশুপালন ও জীবনযাত্রা:
শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি মানুষ পশুপালন শুরু করে।
পশুপালনের প্রাচীনতম প্রমাণ: রাজস্থানের বাঠোর (Bagor) এবং মধ্যপ্রদেশের আদমগড় (Adamgarh)-এ আনুমানিক ৫০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পশুপালনের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায়। বাঠোর হলো ভারতের বৃহত্তম মেসোলিথিক কেন্দ্র।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমূহ:
লাঘনাজ (Langhnaj, গুজরাট): মানব কঙ্কালের সঙ্গে কোয়ার্টজাইট নুড়ি পাথরের উপস্থিতি।
সরাই নাহার রাই ও মহাদহা (Sarai Nahar Rai & Mahadaha, উত্তরপ্রদেশ): গাঙ্গেয় অঞ্চলের কেন্দ্র; মহাদহায় যৌথ সমাধি (নর-নারীর জোড়া কবর) এবং পশুর শিঙের অলংকার মেলে।
দমদমা (Damdama, উত্তরপ্রদেশ): একটি সমাধিতে তিনটি নরকঙ্কাল এবং হাতির দাঁতের পেনডেন্ট।
টেরি (Teri, তামিলনাড়ু): উপকূলীয় বালিয়াড়ি অঞ্চল যেখানে মাইক্রোলিথ মেলে।
বীরভানপুর (Birbhanpur, পশ্চিমবঙ্গ): বর্ধমান জেলায় অবস্থিত মেসোলিথিক কেন্দ্র।
ধারণা ও সময়কাল: 'নব্য প্রস্তর বিপ্লব' (Neolithic Revolution - ভি. গর্ডন চাইল্ড কর্তৃক নামাঙ্কিত) নামে পরিচিত এই যুগের সময়কাল আনুমানিক ৮০ও০/৭০ও০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। ১৮৬৫ সালে স্যার জন লুব্বক 'Neolithic' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
প্রধান বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য:
কৃষিকাজের সূচনা ও খাদ্য উৎপাদন (Food Production)।
পশুপালন ও স্থায়ী মানব বসতি স্থাপন।
মসৃণ ও পালিশ করা পাথরের কুঠার/হাতিয়ার (Polished Celts & Axes)।
মৃৎপাত্রের (Pottery - Burnished Grey Ware) ব্যবহার ও কুমোরের চাকা আবিষ্কার।
প্রধান কেন্দ্রসমূহ ও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার:
মেহেরগড় (Mehrgarh, বেলুচিস্তান/পাকিস্তান):
বোলান গিরিপথের কাছে কাচ্চি সমভূমিতে অবস্থিত।
ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষিকাজের (গম ও বার্লি) এবং স্থায়ী বসতির প্রাচীনতম প্রমাণ মেলে (আনুমানিক ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
তুলা চাষের প্রাচীনতম নিদর্শন এবং কাঁচা ইটের তৈরি বহুকক্ষবিশিষ্ট বাড়ি।
বুর্জাহোম (Burzahom, কাশ্মীর):
'Place of Birch' নামে পরিচিত। এখানে মাটির নিচে গর্ত-বাসস্থান বা কূপঘর (Pit-dwellings) পাওয়া গেছে।
মালিকের সাথে পোষা কুকুরকে সমাধিস্থ করার অদ্ভুত প্রথা এখানে দেখা যায়।
গুফক্রাল (Gufkral, কাশ্মীর): 'কুলাল বা কুমোরের গুহা'; গর্ত-বাসস্থান ও গম-মসুর চাষের নিদর্শন।
কোলডিহাওয়া ও মহাগড়া (Koldihwa & Mahagara, উত্তরপ্রদেশ): বেলান উপত্যকায় ধান চাষের (Rice cultivation) প্রাচীনতম প্রমাণ (আনুমানিক ৭০০০-৬০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
চিরাণ্ড (Chirand, বিহার): গঙ্গা নদীর তীরে প্রচুর হরিণের শিঙের তৈরি হাড়ের হাতিয়ার (Bone implements/Antlers) আবিষ্কৃত হয়েছে।
পিকলিহাল, সঙ্গনকল্লু, ব্রহ্মগিরি, হাল্লুর (দক্ষিণ ভারত): গবাদি পশু পালন, অ্যাশ মাউন্ড (Ash mounds) এবং রাগি চাষ।
অর্থ ও বৈশিষ্ট্যাবলী: ধাতু যুগের সূচনা; মানুষ প্রথম যে ধাতু ব্যবহার শুরু করে তা হলো তামা (Copper)। এটি মূলত পাথর ও তামার যৌথ ব্যবহারের পল্লীভিত্তিক কৃষক সমাজ।
প্রধান আঞ্চলিক তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতিসমূহ:
আহার বা বানাস সংস্কৃতি (Ahar / Banas Culture - রাজস্থান):
সময়কাল ও অবস্থান: আনুমানিক ২১০০ - ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; দক্ষিণ-পূর্ব রাজস্থানের বানাস উপত্যকায় অবস্থিত (প্রধান কেন্দ্র: আহার ও গিলুন্দ)।
বিশেষত্ব: আহার-এর প্রাচীন নাম ছিল তাম্বাবতী (তামার স্থান)। এখানে কোনো মাইক্রোলিথিক হাতিয়ার পাওয়া যায়নি; মানুষ তামা গলানো ও ধাতুবিদ্যায় দক্ষ ছিল। বাড়িতে পাথরের প্রলেপ দেখা যায়।
কায়থা সংস্কৃতি (Kayatha Culture - মধ্যপ্রদেশ):
সময়কাল ও অবস্থান: আনুমানিক ২০০০ - ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; চম্বল ও তার উপনদী এলাকায় (উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশ)।
বিশেষত্ব: লাল পটভূমিতে চকলেট রঙের নকশাযুক্ত মৃৎপাত্র; একটি বাড়িতে ২৯টি তামার চুড়ি ও বিশেষ তামার কুঠার মেলে।
মালব সংস্কৃতি (Malwa Culture - মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র):
সময়কাল ও অবস্থান: আনুমানিক ১৭০০ - ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; মধ্য ভারতের নর্মদা উপত্যকায় (প্রধান কেন্দ্র: নবাদাতোলি, এরাণ, নাগদা)।
বিশেষত্ব: মালব মৃৎপাত্র (Malwa ware) তাম্র-প্রস্তর যুগের মৃৎশিল্পের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বর্ণাঢ্য। নবাদাতোলিতে কার্পাস, রেশম, তিসি ও বেদানার অবশেষ মেলে।
জোরওয়ে সংস্কৃতি (Jorwe Culture - মহারাষ্ট্র):
সময়কাল ও অবস্থান: আনুমানিক ১৪০০ - ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; মহারাষ্ট্রের প্রবরা ও গোদাবরী উপত্যকায় (প্রধান কেন্দ্র: দৈমাবাদ, ইনামগাঁও, নেভাসা, চান্দোলি)।
বিশেষত্ব: দৈমাবাদ (Daimabad) সবচেয়ে বড় কেন্দ্র, যেখানে হরপ্পা সংস্কৃতির প্রভাবযুক্ত ব্রোঞ্জের রথ ও পশু মূর্তি মেলে। ইনামগাঁও (Inamgaon)-এ ৫ কক্ষবিশিষ্ট বাড়ি, শস্যাগার, মাতৃদেবীর মূর্তি এবং চার পা-বিশিষ্ট মৃৎপাত্রে শায়িত বিশেষ সমাধি মেলে।
গণেশ্বর-যোধপুরা সংস্কৃতি (Ganeshwar Culture - রাজস্থান):
সময়কাল ও এলাকা: আনুমানিক ২৮০০ - ২২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; খেত্রী তামা অঞ্চলের কাছে সিকর জেলায় অবস্থিত।
বিশেষত্ব: হরপ্পা সভ্যতাকে তামা ও তাম্রদ্রব্য সরবরাহ করতো; এখান থেকে OCP (Ochre-Coloured Pottery) এবং প্রচুর তামার تیر, বর্ষা ও তীরের ফলক মেলে।
বাংলা ও পূর্ব ভারতের কেন্দ্রসমূহ:
পশ্চিমবঙ্গ: পাণ্ডু রাজার ঢিবি (বর্ধমান), মহিষদল (বীরভূম)।
বিহার: চিরাণ্ড, সোণপুর, তারাদিহি।
তামা ভাণ্ডার এবং গেরুয়া মৃৎপাত্র (Copper Hoards and OCP):
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে (বিশেষত গঙ্গা-যমুনা দোয়াব, মধ্যপ্রদেশ, বিহার ও ওড়িশা) ৮০টিরও বেশি তামা ভাণ্ডার পাওয়া গেছে, যেখানে তামার আংটি, কুঠার, তলোয়ার, হারপুন ও মনুষ্যাকৃতি মূর্তি মেলে।
সবচেয়ে বড় তামার ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে মধ্যপ্রদেশের গুঞ্জেরিয়া (Gungeria) থেকে (৪২৪টি তামার হাতিয়ার ও ১০২টি রুপোর পাত)।
OCP বা Ochre-Coloured Pottery হলো গেরুয়া রঙের মৃৎশিল্প যা তামা ভাণ্ডার সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত।
১. জীবনধারণের উপায় (Subsistence Economy):
প্রাচীন প্রস্তর যুগ: খাদ্য সংগ্রহ ও বন্যপশু শিকার (Food Gathering & Hunting)।
মধ্য প্রস্তর যুগ: শিকার, মাছ ধরা ও পশুপালনের সূচনা (Hunting, Fishing & Early Domestication)।
নব্য প্রস্তর যুগ: কৃষিকাজ ও পূর্ণাঙ্গ পশুপালন (Agriculture & Pastoralism - Food Production)।
তাম্র-প্রস্তর যুগ: কৃষি, পশুপালন, কারুশিল্প ও ধাতুর ব্যবহার।
২. হাতিয়ারের ধরণ (Tool Technology):
প্রাচীন প্রস্তর যুগ: কোয়ার্টজাইট পাথরের ভারী চপার, হ্যান্ড-অ্যাক্স, ফ্লেক, ব্লেড ও বুরিন।
মধ্য প্রস্তর যুগ: ক্ষুদ্রাশ্ম বা মাইক্রোলিথ (১-৫ সেমি আকারের ব্লেড, ক্রিসেন্ট, ট্রাপিজ)।
নব্য প্রস্তর যুগ: ঘষা ও মসৃণ করা পালিশযুক্ত পাথরের কুঠার, কাস্তে, জাঁতা ও হাড়ের হাতিয়ার।
তাম্র-প্রস্তর যুগ: তামার কুঠার, তলোয়ার, তাসের পাতলা ব্লেডের সাথে পাথর ও চ্যালসেডনির মাইক্রোলিথ।
৩. আবাসস্থল (Habitation):
প্রাচীন প্রস্তর যুগ: প্রাকৃতিক গুহা, শৈলাশ্রয় ও খোলা আকাশের নিচে।
মধ্য প্রস্তর যুগ: অস্থায়ী কুঁড়েঘর, গোলাকার বা ডিম্বাকার ঘাসের তৈরি বাসস্থান ও গুহা।
নব্য প্রস্তর যুগ: কাঁচা ইটের বাড়ি, গর্ত-বাসস্থান (Pit dwellings) ও স্থায়ী গ্রাম।
তাম্র-প্রস্তর যুগ: কাদা ও বাঁশের তৈরি আয়তাকার বা গোলাকার বাড়ি (Inamgaon, Ahar)।
৪. শিল্পকলা ও মৃৎপাত্র (Art & Pottery):
প্রাচীন প্রস্তর যুগ: ভীমবেটকার প্রাথমিক গুহাচিত্র (লাল/সবুজ)। মৃৎপাত্র অনুপস্থিত।
মধ্য প্রস্তর যুগ: শিকার, নৃত্য ও সামাজিক জীবনের রঙিন গুহাচিত্র (লাল, সাদা, হলুদ)। হাতে তৈরি অপরিস্কৃত মৃৎপাত্রের প্রাথমিক সূচনা।
নব্য প্রস্তর যুগ: ধোঁয়াটে ধূসর মৃৎপাত্র (Burnished Grey Ware), হাতে ও চাকায় তৈরি মৃৎপাত্র।
তাম্র-প্রস্তর যুগ: চিত্রিত কৃষ্ণ-লোহিত মৃৎপাত্র (Black and Red Ware - BRW), চিত্রিত মালব মৃৎপাত্র।
'নব্য প্রস্তর বিপ্লব' (Neolithic Revolution)-এর তাৎপর্য:
ভি. গর্ডন চাইল্ড নব্য প্রস্তর যুগের পরিবর্তনকে 'বিপ্লব' বলে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ মানুষের অর্থনীতি খাদ্য সংগ্রাহক (Food Gatherer) থেকে খাদ্য উৎপাদকে (Food Producer) রূপান্তরিত হয়।
কৃষির উদভবের ফলে উদ্বৃত্ত উৎপাদন (Surplus production) সম্ভব হয়, যা স্থায়ী বসতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শ্রম বিভাজনের জন্ম দেয়। এটি পরবর্তীকালে হরপ্পা নগর সভ্যতার অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করে।
সামাজিক বৈষম্যের সূচনা (Beginnings of Social Inequality):
তাম্র-প্রস্তর যুগে বসতি বিন্যাস ও সমাধিক্ষেত্র বিশ্লেষণ করলে সামাজিক বৈষম্যের স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়।
উদাহরণস্বরূপ, ইনামগাঁও-এ কারিগররা পশ্চিম প্রান্তে এবং প্রধান নেতা বা সর্দার মধ্যস্থলে বিশাল ৫-কক্ষযুক্ত বাড়িতে বসবাস করতেন।
কিছু সমাধিতে শিশুদের গলায় তামার ও মূল্যবান রত্নের মালা দেওয়া হতো, আবার কিছু সমাধিতে কেবল মাটির পাত্র থাকতো। এটি বংশানুক্রমিক পদমর্যাদা ও ধনবৈষম্যের পরিচয় দেয়।
পরিবেশগত পরিবর্তন ও প্রাক্-ঐতিহাসিক অভিযোজন:
প্লেইস্টোসিন বা বরফ যুগ থেকে হোলোসিন বা উষ্ণ আবহাওয়ায় উত্তরণ উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
ছোট ও দ্রুতগামী পশুর আবির্ভাব মানুষকে ভারী পালিওলিথিক হাতিয়ার ছেড়ে ক্ষুদ্র ও সুনির্দিষ্ট মাইক্রোলিথ তৈরিতে বাধ্য করে, যা ধনুক-তীরের ব্যবহারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
উপমহাদেশে কৃষিকাজের প্রাচীনতম প্রমাণ: বেলুচিস্তানের মেহেরগড় (গম ও বার্লি, আনুমানিক ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
ধান চাষের প্রাচীনতম নিদর্শন: উত্তরপ্রদেশের বেলান উপত্যকার কোলডিহাওয়া ও মহাগড়া।
ভারতে মানব জীবাশ্মের প্রথম আবিষ্কার: মধ্যপ্রদেশের নর্মদা উপত্যকার হাতনাউরা থেকে হোমো ইরেক্টাসের খুলি (আবিষ্কারক: অরুণ সোনাকে)।
মাইক্রোলিথিসমের সূচনা: মেসোলিথিক বা মধ্য প্রস্তর যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য (প্রথম আবিষ্কারক: এ.সি.এল কারলাইল, ১৮৬৭)।
প্রথম গৃহপালিত পশুর প্রমাণ: রাজস্থানের বাঠোর এবং মধ্যপ্রদেশের আদমগড় (আনুমানিক ৫০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
কূপঘর বা গর্ত-বাসস্থান (Pit Dwellings): কাশ্মীরের বুর্জাহোম ও গুফক্রাল।
মালিকের সাথে কুকুর কবর দেওয়ার প্রথা: কাশ্মীরের বুর্জাহোম।
হাড়ের হাতিয়ারের কেন্দ্র: বিহারের চিরাণ্ড (হরিণের শিঙের তৈরি)।
প্রাক্-ঐতিহাসিক শৈলচিত্রের বিখ্যাত স্থান: মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা (আবিষ্কারক: ভি. এস. ওয়াকানকার, ১৯৫৭)।
মানুষের ব্যবহৃত প্রথম ধাতু: তামা (Copper)।
আহার (Ahar) সংস্কৃতির প্রাচীন নাম: তাম্বাবতী (Tambavati)।
বৃহত্তম তামা ভাণ্ডার (Copper Hoard): মধ্যপ্রদেশের গুঞ্জেরিয়া (Gungeria)।
১. ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনতম কৃষিকার্যের প্রমাণ মিলিয়াছে কোথায়? [WBCS Prelims 2019, 2020] (A) প্রতাপগড়
(B) মেহেরগড়
(C) কোয়েটা
(D) কালাট
উত্তর: (B) মেহেরগড়
ব্যাখ্যা: মেহেরগড় (বেলুচিস্তান) থেকে আনুমানিক ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের গম ও বার্লি চাষের প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
২. 'মাইক্রোলিথ' (Microliths) কোন যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য? [WBCS Main 2017] (A) প্রাচীন প্রস্তর যুগ
(B) মধ্য প্রস্তর যুগ
(C) নব্য প্রস্তর যুগ
(D) তাম্র-প্রস্তর যুগ
উত্তর: (B) মধ্য প্রস্তর যুগ
ব্যাখ্যা: মেসোলিথিক বা মধ্য প্রস্তর যুগে ১ থেকে ৫ সেমি আকারের ক্ষুদ্র পাথর দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম হাতিয়ার ব্যবহৃত হতো, যাকে মাইক্রোলিথ বলে।
৩. ভীমবেটকার প্রাক্-ঐতিহাসিক শৈলাশ্রয় কোথায় অবস্থিত? [WBCS Main 2014] (A) অজন্তা
(B) ভাজা
(C) বাঠোর
(D) ভীমবেটকা (মধ্যপ্রদেশ)
উত্তর: (D) ভীমবেটকা (মধ্যপ্রদেশ)
ব্যাখ্যা: মধ্যপ্রদেশের রাইসেন জেলায় ভোপালের দক্ষিণে অবস্থিত ভীমবেটকায় ভারতের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম শৈলচিত্র সংকলন রয়েছে।
৪. কোন অঞ্চলটিকে ভি. গর্ডন চাইল্ড 'বিপ্লবের যুগ' (Period of Revolution) বলে অভিহিত করেছিলেন? [WBCS Main 2017] (A) পালিওলিথিক
(B) মেসোলিথিক
(C) নিওলিথিক
(D) হরপ্পা
উত্তর: (C) নিওলিথিক
ব্যাখ্যা: নব্য প্রস্তর যুগে খাদ্যের সূচনা ও স্থায়ী বাসস্থানের দরুন জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসায় গর্ডন চাইল্ড একে 'Neolithic Revolution' বলেন।
৫. পশুপালনের প্রাচীনতম প্রমাণ ভারতের কোন কেন্দ্রে পাওয়া গেছে? [WBCS Main 2017] (A) বাঠোর ও আদমগড়
(B) বুর্জাহোম
(C) চিরাণ্ড
(D) কোলডিহাওয়া
উত্তর: (A) বাঠোর ও আদমগড়
ব্যাখ্যা: রাজস্থানের বাঠোর এবং মধ্যপ্রদেশের আদমগড় থেকে আনুমানিক ৫০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পশুপালনের প্রাচীনতম নিদর্শন মেলে।
৬. মালিকের সাথে পোষা কুকুরকে কবরে সমাধিস্থ করার প্রথা কোথায় দেখা যায়? (A) মেহেরগড়
(B) বুর্জাহোম
(C) গুফক্রাল
(D) দৈমাবাদ
উত্তর: (B) বুর্জাহোম
ব্যাখ্যা: কাশ্মীরের নব্য প্রস্তরযুগীয় কেন্দ্র বুর্জাহোমে কঙ্কালের পাশাপাশি কুকুরের অস্থিও একই কবরে মেলে।
৭. মানুষ প্রথম কোন ধাতু ব্যবহার শেখে? (A) লোহা
(B) ব্রোঞ্জ
(C) তামা
(D) সোনা
উত্তর: (C) তামা
ব্যাখ্যা: নব্য প্রস্তর যুগের শেষভাগে মানুষ প্রথম তামা ধাতুর ব্যবহার শেখে, যা তাম্র-প্রস্তর যুগের সূচনা করে।
৮. 'তাম্বাবতী' (Tambavati) নামে পরিচিত তাম্র-প্রস্তরযুগীয় কেন্দ্র কোনটি?
(A) আহার (Ahar)
(B) কায়থা
(C) মালব
(D) জোরওয়ে
উত্তর: (A) আহার (Ahar)
ব্যাখ্যা: রাজস্থানের আহার কেন্দ্রটি তামার প্রাচুর্যের জন্য প্রাচীনকালে 'তাম্বাবতী' নামে পরিচিত ছিল।
৯. ভারতের কোথায় প্রথম মানব খুলির জীবাশ্ম (Homo erectus) আবিষ্কৃত হয়? (A) ভীমবেটকা
(B) হাতনাউরা
(C) আত্তিরামপাক্কাম
(D) সোয়ান উপত্যকা
উত্তর: (B) হাতনাউরা
ব্যাখ্যা: মধ্যপ্রদেশের নর্মদা তীরের হাতনাউরা থেকে হোমো ইরেক্টাস মানবগোষ্ঠীর খুলির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়।
১০. ধান চাষের প্রাচীনতম প্রমাণ কোলডিহাওয়া কোথায় অবস্থিত? (A) বিহার
(B) উত্তরপ্রদেশ
(C) রাজস্থান
(D) মধ্যপ্রদেশ
উত্তর: (B) উত্তরপ্রদেশ
ব্যাখ্যা: উত্তরপ্রদেশের বেলান উপত্যকার কোলডিহাওয়া ও মহাগড়া থেকে ধান চাষের প্রাচীনতম অবশেষ মেলে।
১১. হাড়ের তৈরি হাতিয়ার (Antler tools) বিপুল পরিমাণে কোথায় আবিষ্কৃত হয়েছে? (A) চিরাণ্ড
(B) ইনামগাঁও
(C) লানঘনাজ
(D) নেভাসা
উত্তর: (A) চিরাণ্ড
ব্যাখ্যা: বিহারের সারণ জেলায় গঙ্গাতীরের চিরাণ্ড কেন্দ্র থেকে হরিণের শিঙের তৈরি প্রচুর হাড়ের হাতিয়ার মেলে।
১২. সোপান বা সোহান সংস্কৃতি (Sohan Culture) কোন যুগের সাথে সম্পর্কিত? (A) নিম্ন প্রাচীন প্রস্তর যুগ
(B) মধ্য প্রস্তর যুগ
(C) নব্য প্রস্তর যুগ
(D) তাম্র-প্রস্তর যুগ
উত্তর: (A) নিম্ন প্রাচীন প্রস্তর যুগ
ব্যাখ্যা: পাকিস্তানের সোহান নদী উপত্যকার চপার-চপিং পেবল হাতিয়ার শিল্প নিম্ন প্রাচীন প্রস্তর যুগের অন্তর্ভুক্ত।
১৩. 'কূপঘর' বা Pit-dwellings কোন অঞ্চলের নিওলিথিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য? (A) দক্ষিণ ভারত
(B) কাশ্মীর উপত্যকা
(C) আসাম
(D) গাঙ্গেয় উপত্যকা
উত্তর: (B) কাশ্মীর উপত্যকা
ব্যাখ্যা: কাশ্মীরের বুর্জাহোম ও গুফক্রালে মাটির নিচে কূপ তৈরি করে তীব্র শীত থেকে বাঁচার জন্য বসবাস করা হতো।
১৪. ব্রোঞ্জের রথ ও পশুমূর্তির জন্য বিখ্যাত তাম্র-প্রস্তর কেন্দ্র কোনটি? (A) দৈমাবাদ
(B) ইনামগাঁও
(C) এরাণ
(D) গিলুন্দ
উত্তর: (A) দৈমাবাদ
ব্যাখ্যা: মহারাষ্ট্রের জোরওয়ে সংস্কৃতির অন্তর্গত দৈমাবাদ থেকে হরপ্পা প্রভাবযুক্ত ব্রোঞ্জের রথ, ষাঁড় ও হাতি মেলে।
১৫. আকুলিয়ান (Acheulian) হাতকুঠার শিল্পের বিখ্যাত কেন্দ্র আত্তিরামপাক্কাম কোথায় অবস্থিত? (A) তামিলনাড়ু
(B) কর্ণাটক
(C) অন্ধ্রপ্রদেশ
(D) কেরল
উত্তর: (A) তামিলনাড়ু
ব্যাখ্যা: চেন্নাইয়ের কাছে আত্তিরামপাক্কাম নিম্নে পালিওলিথিক হাতকুঠার সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
১৬. ভারতের সবচেয়ে বড় তাম্র ভাণ্ডার (Copper Hoard) কোথায় পাওয়া গেছে? (A) গুঞ্জেরিয়া
(B) সাইবাই
(C) বিঠুর
(D) রাজপুর পরসু
উত্তর: (A) গুঞ্জেরিয়া
ব্যাখ্যা: মধ্যপ্রদেশের গুঞ্জেরিয়া থেকে ৪২৪টি তামার হাতিয়ার ও ১০২টি রুপোর পাত সমন্বিত ভারতের বৃহত্তম তামা ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়।
১৭. নিম্নের কোনটি মেসোলিথিক যুগের গাঙ্গেয় সমভূমির কেন্দ্র? (A) সরাই নাহার রাই ও মহাদহা
(B) মেহেরগড়
(C) হাল্লুর
(D) কায়থা
উত্তর: (A) সরাই নাহার রাই ও মহাদহা
ব্যাখ্যা: উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড় জেলায় অবস্থিত সরাই নাহার রাই, মহাদহা ও দমদমা গাঙ্গেয় মেসোলিথিক সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র।
১৮. প্রথম সুতিবস্ত্র বা কার্পাস ব্যবহারের প্রমাণ মিলিয়াছে কোথায়? (A) মেহেরগড়
(B) বুর্জাহোম
(C) বাঠোর
(D) ভীমবেটকা
উত্তর: (A) মেহেরগড়
ব্যাখ্যা: মেহেরগড় থেকে পোড়া তুলোর বীজ ও সুতিবস্ত্রের প্রাচীনতম প্রমাণ মেলে।
১৯. পালিওলিথিক যুগের মানুষ মূলত কেমন পাথর ব্যবহার করতো? (A) কোয়ার্টজাইট (Quartzite)
(B) গ্রানাইট
(C) মার্বেল
(D) ব্যাসাল্ট
উত্তর: (A) কোয়ার্টজাইট (Quartzite)
ব্যাখ্যা: পালিওলিথিক যুগের মানুষ শক্ত কোয়ার্টজাইট পাথর দিয়ে হাতিয়ার বানাতো বলে তাদের 'Quartzite Men' বলা হতো।
২০. হরপ্পা সভ্যতাকে তামা সরবরাহ করতো কোন তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতি? (A) গণেশ্বর-যোধপুরা
(B) মালব
(C) জোরওয়ে
(D) কায়থা
উত্তর: (A) গণেশ্বর-যোধপুরা
ব্যাখ্যা: রাজস্থানের খেত্রী তামা অঞ্চলের কাছে অবস্থিত গণেশ্বর সংস্কৃতি হরপ্পা সভ্যতায় তামা রপ্তানি করতো।
২১. ভারতের কোন কেন্দ্রে পালিওলিথিক, মেসোলিথিক ও নিওলিথিক—তিনটি যুগের অনুক্রম (Sequence) পাওয়া গেছে? [WBCS Main 2015] (A) বেলান উপত্যকা (Belan Valley)
(B) কৃষ্ণা উপত্যকা
(C) গোদাবরী উপত্যকা
(D) কাশ্মীর উপত্যকা
উত্তর: (A) বেলান উপত্যকা (Belan Valley)
ব্যাখ্যা: উত্তরপ্রদেশের বিন্ধ্য পাদদেশের বেলান উপত্যকায় প্রাচীন, মধ্য ও নব্য—তিনটি প্রস্তর যুগেরই পর্যায়ক্রমিক প্রামাণ্য স্তর মেলে।
২২. পাঁচ রুমের বাড়ি ও শস্যাগারের প্রমাণ কোন তাম্র-প্রস্তর কেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে? (A) ইনামগাঁও
(B) গিলুন্দ
(C) নবাদাতোলি
(D) এরাণ
উত্তর: (A) ইনামগাঁও
ব্যাখ্যা: মহারাষ্ট্রের ইনামগাঁও-এ সর্দারের বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত ৫ কক্ষবিশিষ্ট ঘর ও তার পাশে শস্যাগার আবিষ্কৃত হয়েছে।
২৩. ভীমবেটকা গুহাচিত্র কে আবিষ্কার করেন? (A) ভি. এস. ওয়াকানকার (V.S. Wakankar)
(B) জন মার্শাল
(C) আর. ডি. ব্যানার্জী
(D) এ. কানিংহাম
উত্তর: (A) ভি. এস. ওয়াকানকার (V.S. Wakankar)
ব্যাখ্যা: ১৯৫৭ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. বিষ্ণু শ্রীধর ওয়াকানকার ভীমবেটকা গুহা আবিষ্কার করেন।
২৪. 'টেরি' (Teri) সাইটগুলি কোন রাজ্যে অবস্থিত উপকূলীয় মেসোলিথিক কেন্দ্র? (A) তামিলনাড়ু
(B) কেরল
(C) ওড়িশা
(D) গুজরাট
উত্তর: (A) তামিলনাড়ু
ব্যাখ্যা: তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন/থুথুকুডি জেলার উপকূলীয় বালিয়াড়ি অঞ্চল 'টেরি' নামে পরিচিত, যেখানে মাইক্রোলিথ মেলে।
২৫. 'অ্যাশ মাউন্ড' (Ash Mounds) বা ছাইয়ের ঢিবি কোন অঞ্চলের নিওলিথিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য? (A) দক্ষিণ ভারত (কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশ)
(B) উত্তর-পূর্ব ভারত
(C) কাশ্মীর
(D) রাজস্থান
উত্তর: (A) দক্ষিণ ভারত (কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশ)
ব্যাখ্যা: পিকলিহাল, উতনুর, বুদিহাল প্রভৃতি দক্ষিণ ভারতীয় নিওলিথিক কেন্দ্রে গোবরের গোয়াল পুড়িয়ে তৈরি বিশাল ছাইয়ের ঢিবি মেলে।
প্রশ্ন ১: ভারতে পালিওলিথিক যুগের তিনটি উপ-পর্যায়ের হাতিয়ার ও প্রযুক্তির বিবর্তন আলোচনা করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: পরিবেশগত পরিবর্তন ও প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে পালিওলিথিক যুগকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
নিম্ন পালিওলিথিক: কোয়ার্টজাইট পাথরের ভারী চপার, চপিং হাতিয়ার ও হ্যান্ড-অ্যাক্স (আকুলিয়ান ও সোহান প্রযুক্তি)।
মধ্য পালিওলিথিক: ফ্লেক বা চাঁই কেন্দ্রিক প্রযুক্তি; চাঁছনি (Scraper), পয়েন্ট ও বিদ্ধকরণ হাতিয়ারের প্রাধান্য।
উচ্চ পালিওলিথিক: ব্লেড ও বুরিন (Blade & Burin) শিল্প; আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাব এবং সূক্ষ্ম কাটিং এজ হাতিয়ার।
উপসংহার: হাতিয়ারের আকার ও ওজনের হ্রাস মানুষের মানসিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্রমবিকাশকে চিহ্নিত করে।
প্রশ্ন ২: মেসোলিথিক যুগের মাইক্রোলিথিক প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের শিকার ও জীবিকায় পরিবর্তন এনেছিল?
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: মেসোলিথিক যুগের প্রধান পরিচয় হলো ১-৫ সেমি আকৃতির অতি ক্ষুদ্র পাথরের হাতিয়ার বা মাইক্রোলিথ।
হাতিয়ারের ধরন: ত্রিভুজ, ট্রাপিজ, ক্রিসেন্ট ইত্যাদি জ্যামিতিক নকশার ব্লেডলেট।
শিকার ও জীবিকায় প্রভাব: মাইক্রোলিথগুলোকে কাঠ বা হাড়ের হাতলে বসিয়ে ধনুক-তীর, বর্ষা, কাস্তে ও হারপুন হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এর ফলে ছোট ও দ্রুতগামী পশু শিকার, পাখি ধরা এবং মাছ ধরা সহজ হয়।
উপসংহার: মাইক্রোলিথিক প্রযুক্তি শিকারী-সংগ্রাহক সমাজকে ক্রমশ স্থায়িত্বের দিকে নিয়ে যায় এবং পশুপালনের পথ প্রশস্ত করে।
প্রশ্ন ৩: ভি. গর্ডন চাইল্ড প্রবর্তিত 'নব্য প্রস্তর বিপ্লব' (Neolithic Revolution) ধারণার যথার্থতা বিচার করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: গর্ডন চাইল্ড নব্য প্রস্তর যুগীয় রূপান্তরকে মানব ইতিহাসের প্রথম 'বিপ্লব' বলে অভিহিত করেন।
বৈপ্লবিক উপাদান: (১) খাদ্য সংগ্রহ থেকে খাদ্য উৎপাদনে রূপান্তর (কৃষির সূচনা—গম, বার্লি, ধান)। (২) যাযাবর জীবন ত্যাগ করে মেহেরগড় বা বুর্জাহোমের মতো স্থায়ী গ্রাম গড়ে তোলা। (৩) পালিশ করা কুঠার ও মৃৎপাত্র নির্মাণ।
সমালোচনা/মূল্যায়ন: আধুনিক গবেষকরা মনে করেন এটি একদিনের বিপ্লব নয়, বরং দীর্ঘকালীন ধীর সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবর্তন। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বৈপ্লবিক ছিল।
প্রশ্ন ৪: মেহেরগড় প্রত্নক্ষেত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং হরপ্পা সভ্যতার উৎপত্তিতে এর অবদান আলোচনা করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: বেলুচিস্তানের বোলান গিরিপথের কাছে জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ কর্তৃক আবিষ্কৃত মেহেরগড় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নব্য প্রস্তরযুগীয় কেন্দ্র।
প্রধান আবিষ্কার: ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কৃষিকাজ (গম, বার্লি, তুলা), কাঁচা ইটের বহুকক্ষীয় বাড়ি, দরজাবিহীন শস্যাগার ও পশুপালন।
হরপ্পা সভ্যতার ভিত্তি: মেহেরগড় পর্যায়ক্রমিক ধারায় (Period I to VII) গ্রাম কেন্দ্রিক সংস্কৃতি থেকে প্রাক-হরপ্পা ও নগর সংস্কৃতির দিকে রূপান্তরিত হয়, যা প্রমাণ করে হরপ্পা সভ্যতা বহিরাগত নয় বরং স্থানীয় বিবর্তনের ফল।
প্রশ্ন ৫: কাশ্মীরের বুর্জাহোম ও গুফক্রাল সংস্কৃতির বিশেষ ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যাবলী ব্যাখ্যা করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: কাশ্মীর উপত্যকার নিওলিথিক সংস্কৃতি সিন্ধু সমভূমির তুলনায় সম্পূর্ণ পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল।
গর্ত-বাসস্থান (Pit Dwellings): তীব্র শীত ও তুষারপাত থেকে বাঁচতে ৪ মিটার গভীর গোলাকার বা ডিম্বাকার কূপঘর নির্মাণ।
সমাধি প্রথা: মানুষের কবরে তার পোষা কুকুর বা ছাগল সমাধিস্থ করার অনন্য সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস।
অন্যান্য: হাড়ের সুচ ও হাতিয়ারের ব্যবহার এবং তৎকালীন হরপ্পা সভ্যতার সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ।
প্রশ্ন ৬: ভারতের প্রধান তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতির (Chalcolithic Cultures) ভৌগোলিক বিস্তার ও বৈশিষ্ট্যাবলী সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতি হলো তামা ও পাথরের সমন্বয়ে গঠিত গ্রামীণ কৃষক সংস্কৃতি।
প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
আহার/বানাস (রাজস্থান): তামা গলানো ও পাথরের ব্যবহারের অনুপস্থিতি।
মালব (মধ্যপ্রদেশ): চমৎকার নকশাযুক্ত মালব মাটির পাত্র।
জোরওয়ে (মহারাষ্ট্র): দৈমাবাদ ও ইনামগাঁও—বৃহৎ গ্রাম ও সর্দারতন্ত্রের প্রারম্ভিক চিহ্ন।
উপসংহার: স্থানভিত্তিক বৈচিত্র্য সত্ত্বেও এগুলি হরপ্পা-উত্তর ভারতের প্রথম কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ গঠন করে।
প্রশ্ন ৭: 'তামা ভাণ্ডার' (Copper Hoards) এবং 'গেরুয়া মৃৎপাত্র' (OCP) সংস্কৃতির মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: ভারতের গঙ্গা-যমুনা দোয়াব ও ছোটনাগপুর অঞ্চলে আবিষ্কৃত তামার হাতিয়ারের স্তূপ 'তামা ভাণ্ডার' এবং বিশেষ মৃৎপাত্র 'OCP' নামে পরিচিত।
উপাদান ও কেন্দ্র: গুঞ্জেরিয়া, রাজপুর পরসু, হস্তিনাপুর প্রভৃতি স্থানে তলোয়ার, হারপুন, মানবমূর্তি পাওয়া গেছে।
পারস্পরিক সম্পর্ক: বেশিরভাগ তামা ভাণ্ডার প্রত্নক্ষেত্রেই OCP বা Ochre Coloured Pottery-র উপস্থিতি মেলে, যা নির্দেশ করে এরা একই সময়কালের (২৫০০ - ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) আদি-বৈদিক বা ঋগ্বেদিক পূর্ব সংস্কৃতির প্রতিনিধি ছিল।
প্রশ্ন ৮: ভীমবেটকার প্রাক্-ঐতিহাসিক গুহাচিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনের কী রূপ ফুটে ওঠে?
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: রাইসেন (মধ্যপ্রদেশ) জেলার ভীমবেটকা হলো পালিওলিথিক থেকে মেসোলিথিক যুগের অন্যতম সেরা মানব শিল্পশালা।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপ:
শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ: দলবদ্ধ পশু শিকার, মাছ ধরা, মধু সংগ্রহের দৃশ্য।
লিঙ্গভিত্তিক শ্রম: নারী ও পুরুষের যৌথ শিকার এবং নাচ-গানের মাধ্যমে উৎসব পালনের দৃশ্য।
প্রাণীকুল: ২৯ ধরনের পশুর ছবি (হরিণ, গণ্ডার, মহিষ), যা তৎকালীন প্রাক্-ঐতিহাসিক পরিবেশ নির্দেশ করে।
প্রশ্ন ৯: ইনামগাঁও (Inamgaon) প্রত্নক্ষেত্রের খননকার্য কীভাবে তাম্র-প্রস্তর যুগের সামাজিক বৈষম্য ও জটিলতার প্রকাশ ঘটায়?
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: মহারাষ্ট্রের প্রবরা উপত্যকার ইনামগাঁও জোরওয়ে সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র।
বসতি বিন্যাস: কেন্দ্রে সর্দারের ৫-কক্ষযুক্ত বিশাল বাড়ি ও শস্যাগার; অপরদিকে প্রান্তসীমায় সাধারণ কারিগরদের ছোট ঘর।
সমাধি বৈষম্য: সাধারণ সমাধি বনাম মাটির বড় চাকাযুক্ত পাত্রে বা কোর্টইয়ার্ডে চার পা-ওয়ালা বিশেষ জারে বিশেষ কায়দায় সর্দারের সমাধি।
উপসংহার: ইনামগাঁও থেকে প্রমাণ হয় যে তাম্র-প্রস্তর যুগে সমাজে প্রথম শ্রেণিভেদ ও নেতৃত্বমূলক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল।
প্রশ্ন ১০: প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগের ভারতীয় ইতিহাসে পরিবেশগত প্রভাব ও স্থানান্তরের গুরুত্ব মূল্যায়ন করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: ভূতাত্ত্বিক যুগ পর্যায় (প্লেইস্টোসিন থেকে হোলোসিন) প্রাক্-ঐতিহাসিক সংস্কৃতি নির্মাণে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
জলবায়ুর পরিবর্তন: তুষার যুগের শুষ্ক ও শীতল আবহাওয়া থেকে হোলোসিনের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় পরিবর্তন ঘাসজমি, বন জঙ্গল এবং ছোট পশুর সংখ্যা বাড়িয়ে তোলে।
সাংস্কৃতিক রূপান্তর: পালিওলিথিক মানুষের নদী উপত্যকা ও গুহা থেকে মেসোলিথিক/নিওলিথিক যুগে সমতল ভূমি ও কৃষিক্ষেত্রে স্থানান্তর ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, বেলান উপত্যকায় তিনটি যুগেরই ধারাবাহিক উপস্থিতি জলবায়ু অভিযোজনের অনন্য প্রমাণ দেয়।