ব্রোঞ্জ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন সিন্ধু সভ্যতা (Indus Valley Civilization) প্রাচীন ভারতের প্রথম নগরায়ন বা 'First Urbanization'-এর প্রতিনিধিত্ব করে। আনুমানিক ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে বিকাশ লাভ করা এই তাম্র-ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতাটি তার অভূতপূর্ব নগর পরিকল্পনা, বিজ্ঞানসম্মত ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থা, পোড়া ইটের ব্যবহার এবং সুদূরপ্রসারী বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত। WBCS প্রিলিমিনারি এবং মেনস পরীক্ষায় (Paper III) প্রাচীন ইতিহাসের যে অধ্যায়গুলি থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে, তার মধ্যে সিন্ধু সভ্যতার ভৌগোলিক বিস্তার, প্রধান প্রত্নক্ষেত্র, আবিষ্কারক এবং স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অন্যতম প্রধান।
নামকরণ: ১৯২১ সালে ড. দয়ারাম সাহানি কর্তৃক প্রথম আবিষ্কৃত কেন্দ্র 'হরপ্পা'-র নামানুসারে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় একে হরপ্পা সভ্যতা (Harappan Culture) বলা হয়। সিন্ধু নদী ও তার শাখা নদী উপত্যকায় বিকাশ ঘটায় একে প্রাথমিক পর্যায়ে 'সিন্ধু সভ্যতা' বলা হতো।
সময়কাল:
প্রারম্ভিক হরপ্পা পর্ব (Early Harappan Phase): আনুমানিক ৩০০০ – ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
পরিণত বা নগরীয় হরপ্পা পর্ব (Mature Harappan Phase): আনুমানিক ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
উত্তর বা পরবর্তী হরপ্পা পর্ব (Late Harappan Phase): আনুমানিক ১৯০০ – ১৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
উৎপত্তি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি:
পূর্বে হুইলার বা গার্ডন চাইল্ডের মতো পণ্ডিতরা মনে করতেন যে মেসোপটেমীয় সভ্যতার প্রভাবে এই সভ্যতার আকস্মিক উৎপত্তি ঘটেছিল।
তবে আধুনিক খননকার্য (যেমন মেহেরগড়, কোট ডিজি, আমরি, কালিবঙ্গান-এর প্রাক-হরপ্পা পর্যায়) প্রমাণ করেছে যে, এই সভ্যতা কোনো বহিরাগত প্রভাবে নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশের প্রাক-হরপ্পা চালকোলিথিক বা নব্য-প্রস্তরযুগীয় গ্রামীণ কৃষক সমাজের ধারাবাহিক বিবর্তনের ফলে দেশজভাবেই গড়ে উঠেছিল।
সিন্ধু সভ্যতা প্রায় ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার (বা ১.৩ মিলিয়ন বর্গ কিমি) এলাকা জুড়ে একটি বিশাল ত্রিভুজাকারে বিস্তৃত ছিল। এটি বর্তমান ভারত (পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, গুজরাট, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর) এবং পাকিস্তানের (পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান) বিস্তৃত অঞ্চলকে আচ্ছাদিত করেছিল।
উত্তর সীমান্ত বিন্দু (Northernmost Boundary):
মান্ডা (Manda): জম্মু ও কাশ্মীরের আখণুর জেলায় চেনাব (আসিকনী) নদীর তীরে অবস্থিত। এটি পরিণামমুখী হরপ্পা সভ্যতার উত্তরতম সীমা।
দক্ষিণ সীমান্ত বিন্দু (Southernmost Boundary):
দাইমাবাদ (Daimabad): মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলায় প্রবরা (গোদাবরীর উপনদী) নদীর তীরে অবস্থিত।
পশ্চিম সীমান্ত বিন্দু (Westernmost Boundary):
সুতকাজেনডোর (Sutkagen-dor): পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে বেলুচিস্তানের মকরান উপকূলে দাশত (Dasht) নদীর তীরে स्थित একটি উপকূলীয় বাণিজ্য কেন্দ্র।
পূর্ব সীমান্ত বিন্দু (Easternmost Boundary):
আলমগীরপুর (Alamgirpur): উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলায় হিন্দন (যমুনার উপনদী) নদীর তীরে অবস্থিত।
১. হরপ্পা (Harappa)
অবস্থান: পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শাহিওয়াল (সাবেক মন্টগোমারি) জেলায় রাভি বা ইরাবতী নদীর বাম তীরে অবস্থিত।
খননকার্য: ১৯২১ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)-র অধিকর্তা স্যার জন মার্শালের অধীনে দয়ারাম সাহানি (Daya Ram Sahni) প্রথম এখানে খননকার্য শুরু করেন। পরবর্তীকালে এম. এস. ভাটস (১৯৪০) ও প্রাক-স্বাধীনতা পর্বে মরটিমার হুইলার (১৯৪৬) খনন পরিচালনা করেন।
প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার:
সিটাডেল বা দুর্গের বাইরে দুই সারিতে ৬টি করে মোট ১২টি শস্যাগার (Granaries in two rows of six)।
শস্য মাড়াইয়ের জন্য বৃত্তাকার ইটের চাতাল (Circular working platforms) যেখানে গম ও বার্লির অবশেষ মেলে।
শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য দুই কক্ষবিশিষ্ট ব্যারাক (Workers' Barracks)।
তামা গলানোর মুচি (Bronze crucible) এবং 'গোরস্থান এইচ' (Cemetery H) ও R-37 কবরস্থান।
২. মহেঞ্জোদারো (Mohenjo-daro)
অর্থ ও অবস্থান: সিন্ধি ভাষায় 'মহেঞ্জোদারো' শব্দের অর্থ "মৃতের স্তূপ" (Mound of the Dead)। এটি পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় সিন্ধু নদীর ডান তীরে অবস্থিত।
খননকার্য: ১৯২২ সালে বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (Rakhal Das Banerjee) এটি আবিষ্কার করেন। পরে আর্নেস্ট মেকায় (১৯৩৮) ও জন মার্শাল এখানে ব্যাপক খননকার্য চালান।
প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার:
বৃহৎ স্নানাগার (Great Bath): ১১.৮৮ মি × ৭.০১ মি দৈর্ঘ্য-প্রস্থ এবং ২.৪৩ মি গভীর একটি জলাশয়, যা ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
বৃহৎ শস্যাগার (Great Granary): ৪৫.৭১ মি দীর্ঘ ও ১৫.২৩ মি চওড়া; এটি মহেঞ্জোদারোর বৃহত্তম অট্টালিকা।
ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যরতা বালিকার মূর্তি (Bronze Dancing Girl Statue)।
স্ট্যাটাইট বা নরম পাথরের তৈরি 'দাড়িওয়ালা পুরোহিত-রাজা' (Bearded Priest-King)-র মূর্তি।
পশুপতি শিবের সিলমোহর (Pashupati Seal) এবং ইউনিকর্ন সিলমোহর।
প্রায় ৭০০টি পানীয় জলের কুয়ো।
৩. লোথাল (Lothal)
অবস্থান: গুজরাটের আমেদাবাদ জেলায় ভোগাবো (Bhogavo) নদীর তীরে খাম্বাত উপসাগরের মাথায় অবস্থিত।
খননকার্য: ১৯৫৫–১৯৬২ সালের মধ্যে এস. আর. রাও (S.R. Rao) এখানে খননকার্য পরিচালনা করেন।
প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার:
বিশ্বের প্রাচীনতম জোয়ার-ভাটা ভিত্তিক কৃত্রিম পোতাশ্রয় (Tidal Dockyard): যা সিন্ধু সভ্যতার সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
ধানের তুষ বা অবশেষ (Rice husk - আনুমানিক ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
পুঁতি তৈরির কারখানা (Bead-making factory)।
অগ্নিবেদী (Fire Altars) এবং পোড়ামাটির জাহাজের মডেল ও ঘোড়ার মূর্তি।
৪. ধোলাভিরা (Dholavira)
অবস্থান: গুজরাটের কচ্ছ জেলার খাদির দ্বীপে অবস্থিত।
খননকার্য: ১৯৬৭-৬৮ সালে জে. পি. জোশী এটি চিহ্নিত করেন এবং ১৯৯০ সালে আর. এস. বিস্ত (R.S. Bisht) এর ব্যাপক খননকার্য পরিচালনা করেন।
প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার:
শহরটি প্রচলিত দ্বি-বিভাজনের পরিবর্তে তিনটি অংশে বিভক্ত (Three-tier town): সিটাডেল (Citadel), মধ্য নগর (Middle Town) এবং নিম্ন নগর (Lower Town)।
পাথর কাটাই ও পাথরের গাঁথুনির অভূতপূর্ব স্থাপত্য (Stone Architecture)।
বিশাল জল সংরক্ষণাগার ও বাঁধ (Water Reservoirs): জল ব্যবস্থাপনার চমৎকার উদাহরণ।
১০টি বৃহদাকৃতির হরপ্পান হরফযুক্ত প্রাচীন কাঠের সাইনবোর্ড (Signboard)।
৫. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রসমূহ:
কালিবঙ্গান (Kalibangan - রাজস্থান): শব্দার্থ "কালো চুড়ি"। আবিষ্কারক বি. বি. লাল ও বি. কে. থাপার। বৈশিষ্ট্য: জোতা কাঠের লাঙল চষা জমি (Ploughed field), উটের হাড়, অগ্নিবেদী এবং ইটের চাতাল।
বনওয়ালি (Banawali - হরিয়ানা): আবিষ্কারক আর. এস. বিস্ত। বৈশিষ্ট্য: উন্নতমানের বার্লি এবং পোড়ামাটির লাঙলের মডেল।
সুরকোটাদা (Surkotada - গুজরাট): আবিষ্কারক জে. পি. জোশী। বৈশিষ্ট্য: ঘোড়ার কঙ্কাল বা অস্থি উদ্ধার (Horse remains - আনুমানিক ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
রাখিগড়ি (Rakhigarhi - হরিয়ানা): ঘর্ঘরা নদীর তীরে অবস্থিত; এটি ভারতে অবস্থিত সিন্ধু সভ্যতার বৃহত্তম কেন্দ্র (২৫০ হেক্টর)।
চানহুদারো (Chanhudaro - সিন্ধু, পাকিস্তান): আবিষ্কারক এন. জি. মজুমদার (১৯৩১)। এটি একমাত্র হরপ্পান শহর যেখানে কোনো দুর্গ বা সিটাডেল ছিল না (City without Citadel); শিল্প ও পুঁতি নির্মাণের প্রধান কেন্দ্র।
১. গ্রিড প্রথা ও রাজপথ (Grid System & Roads)
হরপ্পার শহরগুলি একটি নিখুঁত গ্রিড প্রথা (Grid pattern) অনুসরণ করে গড়ে উঠেছিল, যেখানে প্রধান রাস্তাগুলি উত্তর-দক্ষিণে এবং পূর্ব-পশ্চিমে একে অপরকে সমকোণে (৯০০ কোণে) ছেদ করতো।
এর ফলে শহরটি কতগুলি আয়তক্ষেত্রাকার ব্লকে (Rectangular blocks) বিভক্ত হয়ে যেত।
রাস্তাগুলি বেশ প্রশস্ত ছিল এবং রাস্তার মোড়ে আলো ও আবর্জনা ফেলার পাত্র রাখার ব্যবস্থা ছিল।
২. দ্বিমুখী নগর কাঠামো: দুর্গ ও নিম্ন নগর (Citadel & Lower Town)
সাধারণত হরপ্পান শহর দুটি ভাগে বিভক্ত থাকতো:
দুর্গ বা সিটাডেল (Citadel / Acropolis):
শহরের পশ্চিমভাগে ইটের তৈরি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত থাকতো।
এটি চারপাশ প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত ছিল।
শাসকশ্রেণী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং পুরোহিতরা এখানে বসবাস করতেন।
শস্যাগার, বৃহৎ স্নানাগারের মতো পাবলিক বা জনকল্যাণমূলক স্থাপত্য এখানেই অবস্থিত ছিল।
নিম্ন নগর (Lower Town):
শহরের পূর্বভাগে বিস্তৃত এবং অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা।
সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী, কারিগর ও শ্রমিকরা এখানে বসবাস করতেন।
এটিও প্রাকার বা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা থাকতো।
(ব্যতিক্রম: ধোলাভিরা তিন ভাগে বিভক্ত এবং চানহুদারোতে কোনো দুর্গ ছিল না)।
৩. গৃহনির্মাণ স্থাপত্য ও গোপনীয়তা (Domestic Architecture & Privacy)
ঘরবাড়ি তৈরিতে রোদে পোড়ানো বা চুল্লিতে পোড়ানো ইট (Burnt Bricks) ব্যবহার করা হতো। ইটের একটি নির্দিষ্ট প্রমাণ আকার ছিল, যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার অনুপাত ছিল ৪:২:১ (Length : Breadth : Height = 4:2:1)।
প্রতিটি বাড়িতে মাঝখানে একটি খোলা উঠোন (Courtyard) থাকতো এবং তার চারপাশে ঘরগুলি সাজানো থাকতো।
গোপনীয়তার প্রতীক: রাস্তার দিকে কোনো বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে জানলা থাকতো না এবং বাড়ির মূল প্রবেশদ্বার এমনভাবে নির্মিত হতো যাতে বাইর থেকে সরাসরি উঠোন বা ঘরের ভেতর দেখা না যায়।
অধিকাংশ বাড়িতে নিজস্ব স্নানাগার, কুয়ো এবং দোতলায় ওঠার সিঁড়ি থাকতো।
৪. বৃহৎ স্নানাগার (Great Bath - Mohenjo-daro)
এটি মহেঞ্জোদারোর সিটাডেলের ওপর অবস্থিত একটি আয়তক্ষেত্রাকার জলাশয় (১১.৮৮ মি × ৭.০১ মি এবং ২.৪৩ মি গভীর)।
জলাশয়ের মেঝে ও দেয়াল ইট দিয়ে তৈরি এবং জল যাতে চুইয়ে না পড়ে সেজন্য জিপসাম মরটার (Gypsum mortar) ও বিটুমিন (Bitumen / Asphalt)-এর প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল।
উত্তর ও দক্ষিণে স্নানাগারে নামার জন্য সিঁড়ি ছিল এবং চারপাশে পোশাক বদলানোর ঘর ছিল।
পাশের কুয়ো থেকে পরিষ্কার জল আনা হতো এবং নোংরা জল বের করে দেওয়ার জন্য কোণে ড্রেন বা নর্দমা ছিল। এটি মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠানভিত্তিক স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
৫. শস্যাগার (Granaries)
মহেঞ্জোদারোর সিটাডেলে অবস্থিত বৃহৎ শস্যাগারটি (৪৫.৭১ মি × ১৫.২৩ মি) ছিল শহরের বৃহত্তম অট্টালিকা।
হরপ্পার সিটাডেলে ইটের চাতালের ওপর দুই সারিতে ৬টি করে মোট ১২টি শস্যাগার মেলে (যার মোট আয়তন ৮৩৮ বর্গমি)।
শস্য আর্দ্রতামুক্ত রাখতে কাঠের উপরিভাগ এবং বাতাস চলাচলের (Ventilation) বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা ছিল।
৬. ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থা (Underground Drainage System)
সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর সুপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা।
প্রতিটি বাড়ির নোংরা জল প্রথমে সোকেজ পিট (Soak pit)-এ জমা হতো এবং সেখান থেকে পাইপের মাধ্যমে রাস্তার মূল নর্দমায় গিয়ে পড়তো।
রাস্তার নর্দমাগুলি পোড়া ইট বা পাথরের স্ল্যাব (Stone slabs) দিয়ে ঢাকা থাকতো।
নর্দমা পরিষ্কার ও পরিদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে ম্যানহোল (Manholes) বা ইন্সপেকশন পিট রাখা থাকতো।
সমসাময়িক মেসোপটেমিয়া বা মিশরে এমন পরিচ্ছন্ন ও বিজ্ঞানসম্মত নিকাশি ব্যবস্থা দেখা যায় না।
(মোবাইল-ফ্রেন্ডলি পড়ার সুবিধার্থে নিচে তথ্যাবলী কার্ড আকারে সাজানো হলো)
📌 উত্তর সীমান্ত (North): মান্ডা (Manda) | নদী: চেনাব | স্থান: আখণুর, জম্মু ও কাশ্মীর
📌 দক্ষিণ সীমান্ত (South): দাইমাবাদ (Daimabad) | নদী: প্রবরা | স্থান: আহমেদনগর, মহারাষ্ট্র
📌 পশ্চিম সীমান্ত (West): সুতকাজেনডোর (Sutkagen-dor) | নদী: দাশত | স্থান: মকরান উপকূল, বেলুচিস্তান
📌 পূর্ব সীমান্ত (East): আলমগীরপুর (Alamgirpur) | নদী: হিন্দন | স্থান: মিরাট, উত্তরপ্রদেশ
🏛️ হরপ্পা (Harappa): নদী: রাভি (ইরাবতী) | অবস্থান: পাঞ্জাব (পাকিস্তান) | আবিষ্কারক: দয়ারাম সাহানি (১৯২১)
🏛️ মহেঞ্জোদারো (Mohenjo-daro): নদী: সিন্ধু | অবস্থান: সিন্ধু (পাকিস্তান) | আবিষ্কারক: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯২২)
🏛️ লোথাল (Lothal): নদী: ভোগাবো | অবস্থান: গুজরাট (ভারত) | আবিষ্কারক: এস. আর. রাও (১৯৫৫)
🏛️ ধোলাভিরা (Dholavira): নদী: লুনীর নিকট কচ্ছ এলাকা | অবস্থান: গুজরাট (ভারত) | আবিষ্কারক: আর. এস. বিস্ত (১৯৯০)
🏛️ কালিবঙ্গান (Kalibangan): নদী: ঘর্ঘরা | অবস্থান: রাজস্থান (ভারত) | আবিষ্কারক: বি. বি. লাল ও বি. কে. থাপার (১৯৬০)
🏛️ চানহুদারো (Chanhudaro): নদী: সিন্ধু | অবস্থান: সিন্ধু (পাকিস্তান) | আবিষ্কারক: এন. জি. মজুমদার (১৯৩১)
🧱 ইটের অনুপাত: ৪:২:১ (দৈর্ঘ্য : প্রস্থ : উচ্চতা)
📐 রাস্তার বিন্যাস: গ্রিজ পদ্ধতি (Grid System), ৯০ ডিগ্রি সমকোণে ছেদ
🏰 শহরের গঠন: সিটাডেল (উঁচু পশ্চিম অংশ) + নিম্ন নগর (পূর্ব অংশ)
🚰 নিকাশি ব্যবস্থা: ঢাকা দেওয়া ভূগর্ভস্থ ড্রেন, ম্যানহোল ও সোকেজ পিট
💧 বিশেষ স্থাপত্য: মহেঞ্জোদারোর স্নানাগার ও ধোলাভিরার জল সংরক্ষণাগার
হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এর বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে বস্তুগত সংস্কৃতির অভূতপূর্ব অভিন্নতা (Standardization)। জম্মু থেকে গুজরাট পর্যন্ত বিস্তৃত হাজার কিলোমিটার অঞ্চলে ইটের নির্দিষ্ট অনুপাত (৪:২:১), সুনির্দিষ্ট ওজন ও মাপের বাটখারা (Decimal & Binary system), এবং একই ধরনের নকশাযুক্ত লাল ও কালো মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে।
এটি ইঙ্গিত করে যে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কেন্দ্রীয় পৌর প্রশাসন বা নাগরিক কর্তৃপক্ষ (Civic Authority) কাজ করতো, যা শহরের রাস্তা তৈরি, নিকাশি রক্ষা, কর আদায় এবং ইটের আকার নিয়ন্ত্রণ করতো। তবে এখানে কোনো বিশাল রাজপ্রাসাদ বা সামরিক অস্ত্রের আধিক্য না থাকায় ইতিহাসবিদদের মতে, এই কেন্দ্রিয় শক্তি কোনো নিরঙ্কুশ রাজা ছিলেন না, বরং সম্ভবত এক বণিকশ্রেণী বা স্বায়ত্তশাসিত পুরোহিত-প্রশাসক পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হতো।
আনুমানিক ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে সিন্ধু সভ্যতার পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে। ঐতিহাসিকরা এর পতনের জন্য কোনো একক কারণকে দায়ী করেন না:
জলবায়ু পরিবর্তন ও শুষ্কতা (Climate Change): মরটাইমার হুইলার কর্তৃক প্রস্তাবিত 'আর্য আক্রমণ তত্ত্ব' (Aryan Invasion Theory) বর্তমান গবেষণায় বাতিল হয়ে গেছে। রিকস, স্টাইন এবং মাধোসরূপ ভাটসের মতে, ঘর্ঘরা-হাকড়া নদীর গতিপথ পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি ও জলবায়ুর শুষ্কতা কৃষি অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
বন্যা ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা: সিন্ধু নদীর ঘনঘন গতিপথ পরিবর্তন ও বিধ্বংসী বন্যা মহেঞ্জোদারোর মতো শহরকে পরিত্যক্ত করতে বাধ্য করে।
নগর উত্তর পর্ব (Post-Urban Phase): পতন বলতে সভ্যতার সম্পূর্ণ ধ্বংস বোঝায় না, বরং 'ডি-আর্বানাইজেশন' বা বিনগরায়ন বোঝায়। মানুষ বড় নগর ছেড়ে হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে ছোট ছোট গ্রামীণ জনবসতি (যেমন ভগবানপুরা, হুলাস, আলমগীরপুর) গড়ে তোলে।
প্রথম আবিষ্কৃত সিন্ধু কেন্দ্র: হরপ্পা (১৯২১ সালে দয়ারাম সাহানি কর্তৃক)।
মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কারক: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯২২ সাল)।
বিশ্বের প্রাচীনতম কৃত্রিম পোতাশ্রয় (Tidal Dockyard): গুজরাটের লোথাল।
তিনটি স্তরে বিভক্ত সিন্ধু শহর: ধোলাভিরা (গুজরাট)।
দুর্গ বা সিটাডেলবিহীন একমাত্র শহর: চানহুদারো (পাকিস্তান)।
জোতা বা চষা জমির প্রাচীনতম প্রমাণ: রাজস্থানের কালিবঙ্গান।
ঘোড়ার অস্থির অবশেষ প্রাপ্তির কেন্দ্র: গুজরাটের সুরকোটাদা।
ভারতে অবস্থিত বৃহত্তম হরপ্পান কেন্দ্র: হরিয়ানার রাখিগড়ি।
হরপ্পান ইটের প্রমাণ অনুপাত: ৪ : ২ : ১ (দৈর্ঘ্য : প্রস্থ : উচ্চতা)।
সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে উত্তর ও দক্ষিণ বিন্দু: যথাক্রমে মান্ডা (J&K) এবং দাইমাবাদ (মহারাষ্ট্র)।
জল সংরক্ষণাগার ও পাথরের স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত: ধোলাভিরা।
হরপ্পাবাসীদের অজানা ধাতু ও প্রাণী: যথাক্রমে লোহা (Iron) এবং ঘোড়া (সাধারণ সিলমোহরে অনু অনুপস্থিত)।
১. সিন্ধু সভ্যতার কোন কেন্দ্রটিতে বিশ্বের প্রাচীনতম জলোচ্ছ্বাস ভিত্তিক পোতাশ্রয় বা ডকইয়ার্ড আবিষ্কৃত হয়েছে? [WBCS Main 2020, 2022]
(A) মহেঞ্জোদারো
(B) হরপ্পা
(C) লোথাল
(D) কালিবঙ্গান
উত্তর: (C) লোথাল
ব্যাখ্যা: গুজরাটের ভোগাবো নদীর তীরে অবস্থিত লোথাল থেকে একটি ইটের তৈরি কৃত্রিম পোতাশ্রয় মেলে, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল।
২. ১৯২১ সালে হরপ্পা কেন্দ্রটি কে প্রথম খনন করেন? [WBCS Main 2017]
(A) রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
(B) দয়ারাম সাহানি
(C) স্যার জন মার্শাল
(D) আর. এস. বিস্ত
উত্তর: (B) দয়ারাম সাহানি
ব্যাখ্যা: ১৯২১ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনস্থ ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ দয়ারাম সাহানি রাভি নদীর তীরে হরপ্পা আবিষ্কার করেন।
৩. সিন্ধু সভ্যতার নিম্নে উল্লিখিত কোন কেন্দ্রটি ভারতে অবস্থিত বৃহত্তম ক্ষেত্র? [WBCS Main 2020]
(A) ধোলাভিরা
(B) রাখিগড়ি
(C) লোথাল
(D) কালিবঙ্গান
উত্তর: (B) রাখিগড়ি
ব্যাখ্যা: হরিয়ানার ঘর্ঘরা নদী উপত্যকায় অবস্থিত রাখিগড়ি (২৫০ হেক্টর) ভারতের অন্তর্গত বৃহত্তম হরপ্পান কেন্দ্র।
৪. 'মহেঞ্জোদারো' কথাটির অর্থ কী? [WBCS Prelims 2020]
(A) বণিকদের শহর
(B) মৃতের স্তূপ
(C) কালো চুড়ি
(D) শস্যের ভাণ্ডার
উত্তর: (B) মৃতের স্তূপ
ব্যাখ্যা: সিন্ধি ভাষায় 'মহেঞ্জোদারো' শব্দের অর্থ হলো "Mound of the Dead" বা মৃতের স্তূপ।
৫. সিন্ধু সভ্যতার কোন কেন্দ্রটিতে কোনো সিটাডেল বা দুর্গ পাওয়া যায়নি?
(A) চানহুদারো
(B) রোপার
(C) মেহেরগড়
(D) সুরকোটাদা
উত্তর: (A) চানহুদারো
ব্যাখ্যা: সিন্ধু প্রদেশের চানহুদারো হলো একমাত্র হরপ্পান শহর যা সিটাডেল বা উঁচুদুর্গ ছাড়া গঠিত ছিল; এটি শিল্প ও হস্তশিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
৬. হরপ্পান ইটের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার প্রমাণ অনুপাত কত ছিল?
(A) ১ : ২ : ৪
(B) ৪ : ২ : ১
(C) ৩ : ২ : ১
(D) ৫ : ৩ : ১
উত্তর: (B) ৪ : ২ : ১
ব্যাখ্যা: হরপ্পা সভ্যতার সর্বত্র ব্যবহৃত রোদে পোড়ানো বা চুল্লিতে পোড়ানো ইটের নির্দিষ্ট অনুপাত ছিল ৪ : ২ : ১।
৭. নিম্নের কোন হরপ্পান কেন্দ্রে জোতা বা চাষ করা জমির (Ploughed field) প্রমাণ পাওয়া গেছে? [WBCS Prelims 2017, 2019]
(A) কালিবঙ্গান
(B) লোথাল
(C) হরপ্পা
(D) বনওয়ালি
উত্তর: (A) কালিবঙ্গান
ব্যাখ্যা: রাজস্থানের কালিবঙ্গানে প্রাক-হরপ্পা স্তরে কাঠের লাঙল দিয়ে চষা জমির রেখা (Furrows) আবিষ্কৃত হয়েছে।
৮. বিখ্যাত 'বৃহৎ স্নানাগার' (Great Bath) কোথায় আবিষ্কৃত হয়েছে? [WBCS Main 2015]
(A) হরপ্পা
(B) মহেঞ্জোদারো
(C) লোথাল
(D) ধোলাভিরা
উত্তর: (B) মহেঞ্জোদারো
ব্যাখ্যা: মহেঞ্জোদারোর সিটাডেল প্রাঙ্গণে ধর্মীয় স্নানের উদ্দেশ্যে নির্মিত ইটের তৈরি বৃহৎ স্নানাগারটি অবস্থিত।
৯. সিন্ধু সভ্যতার উত্তরতম সীমান্ত বিন্দু 'মান্ডা' কোন নদীর তীরে অবস্থিত? [WBCS Main 2015]
(A) সিন্ধু
(B) চেনাব
(C) জিলম
(D) রাভি
উত্তর: (B) চেনাব
ব্যাখ্যা: জম্মু ও কাশ্মীরের আখণুর জেলায় আসিকনী বা চেনাব নদীর তীরে মান্ডা অবস্থিত।
১০. কোন স্থানটিতে সিন্ধু শহরটি তিনটি অংশে (Citadel, Middle Town, Lower Town) বিভক্ত ছিল? [WBCS Prelims 2020]
(A) সুরকোটাদা
(B) ধোলাভিরা
(C) চানহুদারো
(D) কালিবঙ্গান
উত্তর: (B) ধোলাভিরা
ব্যাখ্যা: গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলে অবস্থিত ধোলাভিরা একমাত্র শহর যা দ্বি-বিভাজনের বদলে ত্রি-স্তরী কাঠামোয় নির্মিত ছিল।
১১. ঘোড়ার কঙ্কালের সুনির্দিষ্ট অবশেষ সিন্ধু সভ্যতার কোথায় মেলে? [WBCS Prelims 2018]
(A) সুরকোটাদা
(B) লোথাল
(C) কালিবঙ্গান
(D) বনওয়ালি
উত্তর: (A) সুরকোটাদা
ব্যাখ্যা: গুজরাটের কচ্ছের সুরকোটাদা থেকে আনুমানিক ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ঘোড়ার কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে।
১২. সিন্ধু সভ্যতার মানুষ কোন ধাতুর ব্যবহার জানতো না? [WBCS Main 2017]
(A) তামা
(B) ব্রোঞ্জ
(C) সোনা
(D) লোহা
উত্তর: (D) লোহা
ব্যাখ্যা: হরপ্পা সভ্যতা ছিল তাম্র-ব্রোঞ্জযুগীয়; ভারতে লৌহ যুগের সূচনা ঘটে আনুমানিক ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বৈদিক যুগে।
১৩. হরপ্পা সভ্যতার দক্ষিণতম সীমান্ত বিন্দু কোনটি?
(A) আলমগীরপুর
(B) সুতকাজেনডোর
(C) দাইমাবাদ
(D) মান্ডা
উত্তর: (C) দাইমাবাদ
ব্যাখ্যা: মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলায় প্রবরা নদীর তীরে দাইমাবাদ হরপ্পা সভ্যতার দক্ষিণতম সীমান্ত বিন্দু।
১৪. 'দাড়িওয়ালা পুরোহিত-রাজা' (Bearded Priest)-র স্ট্যাটাইট মূর্তি কোথায় পাওয়া গেছে?
(A) হরপ্পা
(B) মহেঞ্জোদারো
(C) লোথাল
(D) ধোলাভিরা
উত্তর: (B) মহেঞ্জোদারো
ব্যাখ্যা: মহেঞ্জোদারো থেকে অলঙ্কৃত শাল পরা ধ্যানমগ্ন পুরোহিত-রাজার সুদৃশ্য প্রস্তর মূর্তি উদ্ধার করা হয়।
১৫. ধানের তুষ বা অবশেষ (Rice husk) সিন্ধু সভ্যতার কোথায় পাওয়া গেছে? [WBCS Prelims 2016]
(A) লোথাল ও রংপুর
(B) হরপ্পা ও রোপার
(C) কালিবঙ্গান ও বনওয়ালি
(D) মহেঞ্জোদারো
উত্তর: (A) লোথাল ও রংপুর
ব্যাখ্যা: গুজরাটের লোথাল ও রংপুর কেন্দ্র থেকে ধানের তুষ ও চালের প্রাচীনতম অবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে।
১৬. সুমেরীয় বা মেসোপটেমীয় লেখমালায় সিন্ধু অঞ্চলকে কী নামে অভিহিত করা হয়েছে?
(A) দিলমুন
(B) মগন
(C) মেলুহা
(D) উর
উত্তর: (C) মেলুহা
ব্যাখ্যা: ক্যুনিফর্ম লিপিতে সিন্ধু উপত্যকাকে 'মেলুহা' (Meluhha) নামে নির্দেশ করা হয়েছে।
১৭. হরপ্পা সভ্যতার সিলমোহরে নিচের কোন প্রাণী চিত্রিত দেখা যায় না? [WBCS Prelims 2024]
(A) একশৃঙ্গ ষাঁড় (Unicorn)
(B) হাতি
(C) কুঁজওয়ালা ষাঁড়
(D) ঘোড়া
উত্তর: (D) ঘোড়া
ব্যাখ্যা: সিন্ধু সিলমোহরে ষাঁড়, হাতি, বাঘ, গণ্ডার প্রচুর চিত্রিত হলেও ঘোড়ার চিত্র অনুপস্থিত।
১৮. বিশাল জল সংরক্ষণাগার ও প্রাক-প্রাচীন বাঁধের চমৎকার নিকাশি ব্যবস্থা কোথায় মেলে?
(A) ধোলাভিরা
(B) লোথাল
(C) কালিবঙ্গান
(D) সুতকাজেনডোর
উত্তর: (A) ধোলাভিরা
ব্যাখ্যা: শুষ্ক কচ্ছ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ধোলাভিরায় বৃষ্টি জল ধরে রাখার জন্য বিশাল জলাধার ও পাথর কাটাই নালা বানানো হয়েছিল।
১৯. হরপ্পা শহরের শ্রমিকদের দুই কক্ষবিশিষ্ট ব্যারাক কোথায় আবিষ্কৃত হয়েছে?
(A) মহেঞ্জোদারোর সিটাডেলে
(B) হরপ্পার শস্যাগারের দক্ষিণে
(C) লোথালের ডকইয়ার্ডে
(D) কালিবঙ্গানের নিম্ন নগরে
উত্তর: (B) হরপ্পার শস্যাগারের দক্ষিণে
ব্যাখ্যা: হরপ্পায় ৬টি করে ১২টি শস্যাগারের কাছে গোল ইটের চাতাল এবং শ্রমিকদের থাকার জন্য কটেজ/ব্যারাক মেলে।
২০. নিম্নের কোন জোড়াটি সঠিকভাবে মে মেলানো নেই? [WBCS Prelims 2022]
(A) হরপ্পা — দয়ারাম সাহানি
(B) মহেঞ্জোদারো — রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
(C) কোট ডিজি — এফ. এ. খান
(D) লোথাল — বি. বি. লাল
উত্তর: (D) লোথাল — বি. বি. লাল
ব্যাখ্যা: লোথাল আবিষ্কার করেন এস. আর. রাও (১৯৫৫); বি. বি. লাল খনন করেছিলেন কালিবঙ্গানে।
২১. মহেঞ্জোদারোর বিখ্যাত ব্রোঞ্জের নৃত্যরতা বালিকার মূর্তিটি কোন পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছিল?
(A) লস্ট ওয়াক্স কাস্টিং (Cire Perdue)
(B) ওপেন মোল্ড কাস্টিং
(C) হ্যামারিং টেকনিক
(D) কার্ভিং
উত্তর: (A) লস্ট ওয়াক্স কাস্টিং (Cire Perdue)
ব্যাখ্যা: ধাতুগলানো বিদ্যায় দক্ষ হরপ্পান কারিগররা 'Lost Wax Process'-এ এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি ঢালাই করেছিলেন।
২২. গ্রীকরা সিন্ধু অঞ্চল থেকে উৎপাদিত তুলাকে কী নামে ডাকতো?
(A) সিন্ডন (Sindon)
(B) কার্পাস
(C) মেসোপটেমিয়া
(D) টেক্সটাইলা
উত্তর: (A) সিন্ডন (Sindon)
ব্যাখ্যা: হরপ্পার মানুষ বিশ্বে প্রথম তুলো উৎপাদন করে; সিন্ধু (Sindh) শব্দ থেকে উৎপন্ন 'Sindon' নামে গ্রীকরা একে অভিহিত করতো।
২৩. ভারতের প্রাচীনতম ১০টি বড় হরফযুক্ত কাষ্ঠফলক বা সাইনবোর্ড কোথায় পাওয়া গেছে?
(A) ধোলাভিরা
(B) বনওয়ালি
(C) কালিবঙ্গান
(D) হরপ্পা
উত্তর: (A) ধোলাভিরা
ব্যাখ্যা: ধোলাভিরার উত্তর প্রবেশদ্বারের কাছে কাঠের বোর্ডে স্ট্যাটাইট পাথরের টুকরো বসানো ১০টি বিশাল হরপ্পান হরফ মেলে।
২৪. সিন্ধু নিকাশি ব্যবস্থার সোকেজ পিট এবং ইন্সপেকশন ম্যানহোলগুলি পরিষ্কারের সুবিধার্থে কী দিয়ে ঢাকা থাকতো?
(A) কাঠের তক্তা
(B) পোড়া ইট ও পাথরের স্ল্যাব
(C) খড় ও কাদা
(D) ধাতব ঢাকনা
উত্তর: (B) পোড়া ইট ও পাথরের স্ল্যাব
ব্যাখ্যা: ম্যানহোল ও নর্দমাগুলি সহজে তুলে পরিষ্কার করার জন্য ইটের ঢালাই বা পাথরের স্ল্যাব দিয়ে ঢাকা থাকতো।
২৫. সিন্ধু সভ্যতার পতন সম্পর্কিত 'আর্য আক্রমণ তত্ত্ব'-এর প্রধান প্রবক্তা কে ছিলেন?
(A) স্যার মরটাইমার হুইলার
(B) স্যার জন মার্শাল
(C) এইচ. টি. ল্যামব্রিক
(D) জর্জ ডেলস
উত্তর: (A) স্যার মরটাইমার হুইলার
ব্যাখ্যা: হুইলার ঋগ্বেদের 'পুরন্দর' (দুর্গ ধ্বংসকারী) শব্দ এবং মহেঞ্জোদারোর কঙ্কালের ওপর ভিত্তি করে আর্য আক্রমণের তত্ত্ব দেন, যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়।
প্রশ্ন ১: সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার প্রধান উপাদানসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর রূপরেখা:
ভূমিকা: ব্রোঞ্জযুগীয় সিন্ধু সভ্যতা তার সুনির্দিষ্ট নাগরিক বিন্যাস ও নগর পরিকল্পনার জন্য বিখ্যাত।
প্রধান উপাদানসমূহ:
গ্রিড প্রথা (Grid System): প্রধান রাজপথগুলি সমকোণে (৯০০) ছেদ করে শহরকে আয়তক্ষেত্রাকার ব্লকে ভাগ করতো।
দ্বিমুখী শহর বিন্যাস: উঁচু ইটের মঞ্চে তৈরি পশ্চিমের 'সিটাডেল' (শাসকশ্রেণী) এবং নিচু পূর্বের 'নিম্ন নগর' (সাধারণ নাগরিক)।
পোড়া ইটের অনুপাত: ৪:২:১ নির্দিষ্ট অনুপাতের পোড়া ইটের সুষম ব্যবহার।
নিকাশি ব্যবস্থা: বাড়ি থেকে রাস্তার ঢাকা ভূগর্ভস্থ নর্দমা, সোকেজ পিট ও ম্যানহোল।
উপসংহার: সমসাময়িক মিশর বা মেসোপটেমিয়ার চেয়ে হরপ্পার নগর পরিকল্পনা অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক ও জনকল্যাণমুখী ছিল।
প্রশ্ন ২: মহেঞ্জোদারোর 'বৃহৎ স্নানাগার' (Great Bath)-এর স্থাপত্যশৈলী ও সামাজিক-ধর্মীয় তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর রূপরেখা:
স্থাপত্যশৈলী: সিটাডেলে অবস্থিত ১১.৮৮ মি × ৭.০১ মি × ২.৪৩ মি আয়তনের জলাশয়। মেঝে পোড়া ইটের এবং জলনিরোধক করতে জিপসাম মরটার ও বিটুমিনের প্রলেপযুক্ত। উত্তর ও দক্ষিণে সিঁড়ি, পাশে কুয়ো এবং নোংরা জল বের করার নর্দমা।
তাৎপর্য: এর চারপাশে পোশাক বদলানোর ঘর ও ব্যক্তিগত স্নানাগারের উপস্থিতি প্রমাণ করে এটি সাধারণ ব্যবহারের জন্য নয়, বরং বিশেষ সামাজিক বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক শুদ্ধিস্নানের (Ritual bathing) জন্য ব্যবহৃত হতো।
প্রশ্ন ৩: সিন্ধু সভ্যতার ভৌগোলিক বিস্তার ও এর চার প্রান্তিক সীমান্ত বিন্দুর বিবরণ দাও।
উত্তর রূপরেখা:
বিস্তার: প্রায় ১২.৫ লক্ষ বর্গকিমি জুড়ে ত্রিভুজাকারে ভারত ও পাকিস্তানের বিশাল অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল।
চার সীমান্ত বিন্দু:
উত্তর: মান্ডা (জম্মু ও কাশ্মীর, চেনাব নদী)।
দক্ষিণ: দাইমাবাদ (মহারাষ্ট্র, প্রবরা নদী)।
পশ্চিম: সুতকাজেনডোর (বেলুচিস্তান, দাশত নদী - মকরান উপকূল)।
পূর্ব: আলমগীরপুর (উত্তরপ্রদেশ, হিন্দন নদী)।
তাৎপর্য: এই বিশাল প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের কারণে হরপ্পা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে সাফল্য লাভ করেছিল।
প্রশ্ন ৪: হরপ্পা সভ্যতার সুপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থা (Drainage System) কীভাবে তাদের উন্নত নাগরিক চেতনার পরিচয় দেয়?
উত্তর রূপরেখা:
বৈশিষ্ট্য: প্রতিটি ঘর থেকে নোংরা জল ছোট নর্দমা দিয়ে রাস্তার মূল ঢেকে রাখা নর্দমায় গিয়ে পড়তো।
পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ: নর্দমাগুলি সহজে তুলে পরিষ্কার করার জন্য ইটের স্ল্যাব দিয়ে ঢাকা থাকতো। নির্দিষ্ট দূরত্বে আবর্জনা জমার জন্য সোকেজ পিট এবং ম্যানহোল ছিল।
নাগরিক চেতনা: ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির চেয়ে সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যকে (Public Health) অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, যা রোমান সভ্যতার পূর্বে পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না।
প্রশ্ন ৫: ধোলাভিরা প্রত্নক্ষেত্রের বিশেষ স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও জল সংরক্ষণ ব্যবস্থার মূল্যায়ন করো।
উত্তর রূপরেখা:
বিশেষ বৈশিষ্ট্য: প্রচলিত দ্বি-বিভাজনের পরিবর্তে ধোলাভিরা তিনটি অংশে বিভক্ত ছিল (সিটাডেল, মধ্য নগর, নিম্ন নগর)। এখানে কাঁচা ইটের বদলে পাথরের নিখুঁত গাঁথুনি (Stone Masonry) ব্যবহৃত হয়।
জল সংরক্ষণ (Water Management): শুষ্ক কচ্ছ অঞ্চলে বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য পাথরের বাঁধ, চ্যানেল এবং বিশাল জল সংরক্ষণাগার (Water Reservoirs) তৈরি করা হয়, যা তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার সেরা নিদর্শন।
প্রশ্ন ৬: সিন্ধু সভ্যতার উৎপত্তিতে প্রাক-হরপ্পান বা দেশজ সংস্কৃতির বিবর্তনের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর রূপরেখা:
তত্ত্বের পরিবর্তন: পূর্বে মেসোপটেমীয় অভিবাসনের কথা বলা হলেও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকরা একে দেশজ বিবর্তন বলেন।
প্রমাণপঞ্জি: মেহেরগড়ে (৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) প্রথম কৃষি ও পশুপালন শুরু হয়। পরবর্তীতে আমরি, কোট ডিজি এবং কালিবঙ্গানের প্রাক-হরপ্পান চালকোলিথিক স্তরে ইটের ব্যবহার, মৃত্পাত্র নির্মাণ ও নগর রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ দেখা যায়।
উপসংহার: স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির উদ্বৃত্ত উৎপাদনই ক্রমান্বয়ে নগরীয় হরপ্পা সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়।
প্রশ্ন ৭: লোথাল কেন সিন্ধু সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল?
উত্তর রূপরেখা:
অবস্থান: গুজরাটের ভোগাবো নদীর তীরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্দর।
ডকইয়ার্ড (Dockyard): পোড়া ইটের তৈরি বিশ্বের প্রাচীনতম জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম পোতাশ্রয়, যেখানে সমুদ্রগামী জাহাজ নোঙর করতো।
শিল্প ও রপ্তানি: এখানে সোনা, তামা, শাঁখ ও কার্নেলিয়ান পাথরের পুঁতি তৈরির বড় কারখানা ছিল। পোড়ামাটির জাহাজের মডেল ও মেসোপটেমীয় সিলমোহর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিশ্চিত প্রমাণ দেয়।
প্রশ্ন ৮: হরপ্পান সমাজ ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনায় কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব ছিল কি? যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর রূপরেখা:
কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রমাণ: হাজার কিলোমিটার জুড়ে ইটের সমান অনুপাত (৪:২:১), সুনির্দিষ্ট বাটখারা প্রথা, সুপরিকল্পিত নগর ও নিকাশি রক্ষায় অভিন্ন আইন মেনে চলা।
প্রশাসনের প্রকৃতি: কোনো স্পষ্ট রাজপ্রাসাদ বা অস্ত্রের আধিক্য না থাকায় এটি কোনো সামরিক কেন্দ্র ছিল না। সম্ভবতঃ ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণী বা বণিকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ বা পুরোহিত-প্রশাসক দ্বারা নগর নিয়ন্ত্রিত হতো।
প্রশ্ন ৯: সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণসমূহ পর্যালোচনা করো। 'আর্য আক্রমণ তত্ত্ব' কতখানি গ্রহণযোগ্য?
উত্তর রূপরেখা:
পতনের কারণসমূহ: নদীর গতিপথ পরিবর্তন (ঘর্ঘরা-হাকড়া), জলবায়ুর শুষ্কতা, বন উজাড় ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা।
আর্য আক্রমণ তত্ত্বের সমালোচনা: মরটাইমার হুইলার মহেঞ্জোদারোর কঙ্কালের ওপর ভিত্তি করে আর্য আক্রমণের কথা বলেন। তবে জর্জ ডেলস ও আধুনিক গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে কঙ্কালগুলি একই সময়ের নয় এবং শহরে কোনো ব্যাপক অগ্নিসংযোগের চিহ্ন নেই।
উপসংহার: পরিবেশগত সংকটের দরুন নগরীয় কাঠামোর পতন ঘটে এবং মানুষ গ্রামীণ অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়।
প্রশ্ন ১০: হরপ্পান নগর পরিকল্পনার সাথে আধুনিক শহর গড়ে তোলার কৌশলের তুলনা করো।
উত্তর রূপরেখা:
সাদৃশ্য: গ্রিড প্যাটার্নে রাস্তা তৈরি (বর্তমানে চণ্ডীগড় বা আধুনিক স্মার্ট সিটিতে ব্যবহৃত), ভূগর্ভস্থ ঢেকে রাখা নর্দমা, বজ্র ব্যবস্থাপনা ও আলো জ্বালানোর স্থান নির্ধারণ।
উপাদান ও সুরক্ষার ভারসাম্য: স্থানীয় প্রাকৃতিক উপাদানের (যেমন ধোলাভিরায় পাথর, অন্যত্র পোড়া ইট) ব্যবহার এবং জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
প্রাসঙ্গিকতা: হরপ্পার জনস্বাস্থ্য সচেতনতা ও টেকসই জল ব্যবস্থাপনা বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য এক যুগান্তকারী অনুপ্রেরণা।